Showing posts with label BUET. Show all posts
Showing posts with label BUET. Show all posts

Sunday, January 16, 2011

বুয়েটের স্টুডেন্টস এডভাইজার কাহিণীঃতৃতীয় এবং শেষ পর্ব

গত পর্বের শেষদিকে লিখেছিলাম, একটি হাসির মর্মার্থ বলবো।ঐবার আমার ফোন পেয়ে স্যার আমাদের সাথে দেখা করতে এসেছিলেন।স্যারের কাছে ব্যাপারটার অর্থ ছিল এরকমঃ স্যার আমাদেরকে একটা নির্দিষ্ট সময় দিয়েছিলেন এবং ঐ নির্দিষ্ট সময়ে স্যার রুমে ছিলেন না।আমি তাকে ফোন করে রুমে নিয়ে আসি।ব্যাপারটা অনেকটা স্যারকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়া,যে তিনি নিজেও সময়ানুবর্তী নন।অন্তত স্যারের কাছে ব্যাপারটা অনেকটা সেরকমই মনে হয়েছিল।এবং তার প্রতিশোধ তিনি নিয়েছিলেন, ২ মাস পরেই, সেকথাই এখন বলবো।
গত পর্বের শেষদিকে বলেছিলাম ৩/১ টার্মের রেজিস্ট্রেশনের সময়কার কথা।এই অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের আরেকটি হাস্যকর দিক ছিল, টার্মের মাঝামাঝি সময়ে এডভাইজারের কাছে গিয়ে রেজিস্ট্রেশনের কপি দেখে সেটি ঠিক আছে কিনা চেক করে সিগনেচার করে আসতে হতো।এই কাজটি করার জন্য প্রতি টার্মের ষষ্ঠ/সপ্তম সপ্তাহে একটি নোটিস দেয়া হতো।এই নোটিস দেয়ার এক সপ্তাহের মধ্যে এডভাইজারের সাথে দেখা করতে হতো।২/১ আর ২/২ দুটি টার্মে কাজটি ঠিকমতোই করেছিলাম, বিপত্তি দেখা দিল ৩/১ এ গিয়ে।
৩/১ এ ঐ নোটিসটি ঠিক কখন দিয়েছিল টের পাইনি।এমনকি আমার বন্ধুদের প্রায় কেউই টের পায়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রায় কেউই সময়মতো তাদের এডভাইজারের সাথে দেখা করেনি।এডভাইজারের সাথে দেখা করার শেষদিন এক বন্ধুর কাছে জানতে পারলাম সেদিনই দেখা করার শেষদিন ছিল,তার এডভাইজারের তাকে ফোন করে দেখা করতে বলেছেন।তখনো বুঝতে পারিনি, কত বড় পাপ আমি করেছি।
পরদিন দুরুদুরু বুকে এডভাইজারের সাথে দেখা করতে গেলাম।
স্যারের দরজায় নক করলাম। স্যার ভিতর আসতে বললেনন।কিন্তু না ভিতরে যেতে পারলাম না, দরজায় দাঁড় করিয়েই স্যার আমার সাথে কথা বলা শুরু করলেন।

স্যারঃ তুমি? তুমি কে?
আমিঃ আমি স্যার আপনার এডভাইজি স্যার।
স্যারঃ এক মিনিট।তুমি ঠিক কি বোঝাতে চাইছ বলতো? তুমি কি নিজেকে ছাত্র বলতে চাচ্ছ?
আমিঃ জ্বী স্যার, আমি স্যার আপনার ছাত্র।
স্যারঃ আমার ছাত্রতো অনেক পরের ব্যাপার।আগে তুমি বলো তুমি কি আদৌ কোন ছাত্র?তোমার পেশা কি ছাত্রত্ব?
আমিঃ জ্বী স্যার।
স্যারঃ বাজে কথা বলবেনা।সত্যি করে বলতো তোমার পেশা কি? তুমি কি রিকশা চালাও? ঠেলা গাড়ি চালাও? নাকি দর্জির কাজ কর?
আমিঃ না স্যার, আমি ছাত্র।
স্যারঃ তুমি কি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছো তুমি একজন ছাত্র? তুমি? তুমি ছাত্র? শেষ পর্যন্ত এটাও আমাকে বিশ্বাস করতে হবে?
আমিঃ জ্বী স্যার, মানে স্যার একটু লেট হয়ে গেল।
স্যারঃ লেট হয়ে গেল মানে?
আমিঃ না মানে স্যার রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারটাতে একটু লেট হয়ে গেল।
স্যারঃ রেজিস্ট্রেশন? তুমি রেজিস্ট্রেশন শব্দের মানে বোঝ? এবার তো আমাকে অবাক হতেই হচ্ছে।বলতো রেজিস্ট্রেশন মানে কি?
আমিঃ সরি স্যার লেট হয়ে গেছে।
স্যারঃ তাহলে তুমি সত্যি বলছো তুমি রিকশা বা ঠেলাগাড়ি চালাও না? তুমি একজন ছাত্র?
আমিঃ জ্বী স্যার।
স্যারঃ তাহলে এবার বলো কি জন্যে এসেছ ।
আমিঃ স্যার রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে দেখা করতে এসেছিলাম।
স্যারঃ রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে দেখা করতে এসেছ? তার মানে তুমি জানতে কবে দেখা করতে হবে?
আমিঃ না স্যার, কালই প্রথম জানতে পেরেছি।
স্যারঃ কোথায় থাকো? হলে না বাসায়?
আমিঃ হলে স্যার।
স্যারঃ হলে থাকো? আচ্ছা এসো, বসো।
বসলাম।
স্যারঃ দেখ তো চারকোনা এই কাগজটা চিনতে পারো কিনা? পারছো চিনতে?
আমিঃ জ্বী স্যার।
স্যারঃ এই কাগজটি তুমি প্রতিদিন যেখানে খেতে যাও, সেখানে দিয়ে দেয়া হয়েছিল তোমার পড়ার জন্য।এটা তোমার চোখে পড়েনি?
আমিঃ না স্যার, ঠিক খেয়াল করিনি।
স্যারঃ তা করবে কি করে? যখন কেউ পরীক্ষা পেছানোর মিছিলের নোটিস দেয়, সেটা চোখে পড়তে তো এক মিনিটও সময় লাগেনা।এখন তুমি এক কাজ কর, পুরো নোটিসটা পড়ে শোনাও, আমি শুনি এখানে কি লেখা আছে।
আমিঃ স্যার মানে স্যার...
স্যারঃ এতো মানে জিজ্ঞেশ করার কি হলো? বাংলা পড়তেও জাননা নাকি? তাহলে বল বুয়েটের ভিসিকে বলে বুয়েট থেকে তোমাকে বিদায় করে দেয়ার ব্যাবস্থা করি।
এরপর কম্পমান হাতে নোটিসটি নিয়ে পড়া শুরু করলাম।
নোটিসের উপরে লিখা ছিল "বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়"।তো ভয়ে নাকি তাড়াহুড়া করতে গিয়ে জানিনা, আমি পড়ে ফেললাম "বাংলাদেশ প্রকৌশল বিদ্যালয়"। এরপর স্যারের প্রতিক্রিয়া ছিল এরকমঃ
"বিদ্যালয়? বিদ্যালয়ে পড়ছো তুমি? বুয়েটকে তোমার কাছে বিদ্যালয় মনে হয়?বিদ্যালয়ে কারা পড়ে জানো? কচি শিশুরা।তোমার কি মনে হয় তুমি এখনো কচি শিশু? তুমি কি ডাইনিং এ গিয়ে ভাত না খেয়ে রুমে বসে ফিডার খাও?কচি শিশুরা সকালে ঘুম থেকে উঠতে পারেনা, বড়রা তাদের ঘুম থেকে উঠিয়ে দেন। কচি শিশুরা স্কুলে যাবার সময় তাদের সাথে একটা বিশাল ব্যাগ থাকে, আর থাকে একটা ফিডারের বোতল।এই ফিডারের বোতল সাধারনত শিশুদের সাথে একজন গার্জিয়ান থাকেন, তিনি বহন করেন।তো আমার কি এখন প্রতিদিন সকালে হলে গিয়ে তোমার ঘুম ভাঙ্গাতে হবে? তোমাকে ড্রেসআপ করাতে হবে? তোমার ফিডারের বোতল এক হাতে নিয়ে আরেক হাতে তোমাকে ধরে বুয়েটে নিয়ে আসতে হবে?"

আমার অবস্থা হলো যাকে বলে কেরোসিন।এরপর নোটিসে আর কি কি লিখা ছিল আমি পুরোপুরি মনে করতে পারছিনা।এটুকু মনে আছে, আমি প্রতিটি লাইন পড়ছিলাম আর স্যার সাথে সাথে অপমানজনক কমেন্ট জুড়ে দিচ্ছিলেন।এভাবে প্রায় ১৫ মিনিট পরে নোটিস পড়া শেষ হলো।এরপরের কথাগুলো কিছুটা মনে আছে।
স্যারঃকি? শেষ হয়ে গেলো?
আমিঃ জ্বী স্যার, শেষ হয়ে গেলো।
স্যারঃ বই পড়ে তো কিছু বুঝনা তা ভালোই জানি।এই নোটিসটা পড়ে কি বুঝতে পারলে বলতো?নাকি এটা পড়েও কিছুই বুঝতে পারোনি?
আমিঃ স্যার এই নোটিসে আমাদেরকে গতকালকে পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল নিজ নিজ এডভাইজারের সাথে দেখা করার জন্য।
স্যারঃ তো দেখতেই পাচ্ছো গতকালকে পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছিল তোমাকে।এমনকি আমি আমার কলমের কালি খরচ করে একটা নোটিস লিখে আমার দরজার সামনে টানিয়েও দিয়েছি।সেখানে পরিষ্কার করে লিখে দেয়া আছে কবে কখন আমার সাথে দেখা করতে হবে। তোমার কি ধারনা এসব আমি ফাজলামি করার জন্য করেছি?
আমিঃ না মানে স্যার নোটিসটা ঠিকমতো খেয়াল করিনি।
স্যারঃ খেয়াল করোনি মানে কি? নোটিস কি তোমার চোখে সুপার গ্লু দিয়ে লাগিয়ে দেয়া উচিত ছিল? নাকি আমার উচিত ছিল তোমার কাছে গিয়ে তোমাকে নোটিস পড়ে শোনানো? নাকি আমার উচিত ছিল তোমাকে ফোন করা, যে আমার সাথে তোমাকে দেখা করতে হবে?
আমিঃসরি স্যার।
স্যারঃ আমি কি তোমার জন্য সারাজীবন রেজিস্ট্রেশনের কাগজ নিয়ে বসে থাকবো?শিক্ষকদের কি আর কোন কাজ নেই বলে তোমার ধারনা?তারা কি তাদের সব কাজ বাদ দিয়ে তোমার মতো অছাত্র কুছাত্রদের জন্য পথ চেয়ে বসে থাকবে, কখন তোমাদের মনে দয়া হবে আর তোমরা তাদের কাছে আসবে?

এরকম আরো দুয়েকটি কথা বলার পর স্যার আমাকে এক জায়গায় সিগনেচার করতে বলেন, সিগনেচার করে চলে আসি।

স্যারের রুম থেকে আসার পর ২ ঘন্টা কোন কথা বলতে পারিনি, এবং এরপরের তিনদিন কোন ক্লাসও করিনি, ল্যাবেও যাইনি।

পুনশ্চঃ আমার এডভাইজারের ব্যাবহার এরকম ছিল বলেই মনে করবেন না বুয়েটের প্রতিটি শিক্ষকই তাদের এডভাইজিদের সাথে এমন ব্যাবহার করেন।আমার এক বন্ধু একবার বলেছিল, "দোস্ত, আমি যদি বুয়েট থেকে পাস করে বের হই, তাহলে তাতে আমার চেয়ে আমার এডভাইজারের অবদান মোটেই কম হবেনা।এডভাইজার এতো উৎসাহ না দিলে আমি কোনদিনই বুয়েট থেকে পাস করে বের হতে পারতাম না"।
সুতরাং দোষটা সিস্টেমের নয়, দোষ কিছু শিক্ষকের মনমানসিকতায়।শিক্ষকরা যদি ছাত্রদের গরু ছাগল মনে না করে  মানুষ মনে করেন, তাহলে শিক্ষক তার ছাত্রের সাথে খারাপ ব্যাবহার করলেও তার একটা মাত্রা থাকবে।মানলাম শিক্ষকরা তাদের ব্যাচের সেরা ছাত্র ছিলেন।তার মানে এই নয় যে বুয়েটে অন্যান্য যেসব ছাত্র আসে তারা সবাই গরু ছাগল।সবাই সম্পুর্ণ বিতর্কমুক্ত একটি ভর্তি পরীক্ষার মাধ্যমে দেশের সব মেধাবী ছাত্রদের সাথে প্রতিযোগিতা করেই বুয়েটে চান্স পায়, ঘাস বা গাঁজা খেয়ে নয়।

Thursday, January 13, 2011

বুয়েটের স্টুডেন্টস এডভাইজার কাহিণীঃপর্ব-২

গতপর্বে যেটুকু বলেছিলাম সেটুকুর ব্যাপ্তিকাল ছিল লেভেল-১ টার্ম-১ পর্যন্ত।এরপর লেভেল-১ টার্ম-২ মোটামুটি ঘটনাবিহীনভাবেই কেটে গেল বা কিছু ঘটলেও এখন মনে করতে পারছিনা।
এরপর আসি লেভেল-২ টার্ম-১ এর প্রসঙ্গে।এই টার্মে এসে বুয়েটে চালু হলো অনলাইন রেজিস্ট্রেশন।ব্যাপারটা হলো এরকম, ছাত্রছাত্রীদের রেজিস্ট্রেশনের জন্য একটি ওয়েবসাইট(পড়ুন ঠেলাগাড়ি) তৈরি করা হলো।সেখানে সবাইকে ইউজার নেম এবং পাসওয়ার্ড দিয়ে দেয়া হলো যেটি দিয়ে তারা নিজেদের একাউন্টে ঢুকে চলতি টার্মের কোর্সগুলো রেজিস্ট্রেশন করবে।তারপর সেটি অনলাইনে(পড়ুন ঠেলাগাড়ির মাধ্যমে) এডভাইজারের কাছে চলে যাবে, এবং এডভাইজার সেটি ঠিক থাকলে ডিপার্টমেন্টাল হেড বরাবর পাঠিয়ে দেবেন।
পাঠক তাই বলে ভাববেন না তাহলে তো আর ছাত্রছাত্রীদেরকে তাদের এডভাইজারের সাথে দেখা করতে হচ্ছেনা।অনলাইনে রেজিস্ট্রেশনের পর সবাইকে নিজ নিজ এডভাইজারের সাথে দেখা করতে হবে, কেননা তা না হলে এডভাইজার বুঝবেন কিভাবে যে তার প্রানপ্রিয় ছাত্রটি স্বহস্তে রেজিস্ট্রেশন করেছে? প্রানপ্রিয় ছাত্রটি তার চাঁদবদন প্রদর্শন করার পরই কেবল এডভাইজার তার রেজিস্ট্রেশনটি ডিপার্টমেন্টাল হেড বরাবর পাঠাবেন, তার আগে নয়।
অনলাইনে রেজিস্ট্রেশন করার পর আমাকেও বলা হলো শীঘ্রই আমার এডভাইজারের সাথে দেখা করতে, নতুবা আমার রেজিস্ট্রেশন ফাইনাল হবেনা।গেলাম স্যারের সাথে দেখা করতে।স্যার রুমে নেই।এমনকি আমার জন্য কোন সময় বরাদ্দও দেয়া হয়নি।সেদিন স্যারের কাছে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে দশটায়।বিকালে আবার গেলাম(বিকাল ৪টা-৫টার মধ্যেই কারন এই সময়টুকুই সাধারনত গরু ছাগলদের জন্য বরাদ্দ থাকে) স্যারের রুমে, কিন্তু স্যার নেই।পরদিন আবার গেলাম সকাল ১০ টায়, আবার সেদিনই দুপুর ১২ টায়, বিকাল সাড়ে ৪ টায়।স্যারকে রুমে পেলাম না।এদিকে আমাকে বলে দেয়া হয়েছিল ৩ দিনের মধ্যে স্যারের সাথে দেখা করতে।দুদিন চলে গেছে, স্যারকে রুমে পাইনি।পরদিন আবার সকাল ১০ টায় স্যারের রুমে গেলাম, যথারীতি স্যার রুমে নেই।তারপর সেদিন আবার দুপর ২ টায় স্যারের রুমে গেলাম, এবারো স্যার রুমে নেই।এবার আর থাকতে না পেরে ডিপার্টমেন্ট অফিস থেকে স্যারের মোবাইল নাম্বার নিয়ে ফোন দিলাম।সেই ভয়াবহ ফোনালাপটি এবার বর্ণনা করছি।

আমিঃ স্লামালেকুম স্যার, আপনি কি স্যার আজ রুমে আসবেন?
স্যারঃ কে তুমি? (স্যারের রাগান্বিত গলা শুনে একটু ভড়কে গেলাম)
আমিঃ আমি স্যার মানে স্যার আপনি আমার এডভাইজার স্যার।
স্যারঃ এতো বড় স্পর্ধা তোমার কি করে হলো?
আমিঃ মানে স্যার?
স্যারঃ কত বড় স্পর্ধা তোমার তুমি আমাকে ফোন করে জিজ্ঞেশ করছ আমি রুমে আসব কিনা? আবার মানে জিজ্ঞেশ করছ?
আমিঃ জ্বী স্যার... মানে স্যার...
স্যারঃ আমি রুমে আসি কিনা বা আসবো কিনা সেই কৈফিয়ত কি তোমাকে দিতে হবে?
আমিঃ না স্যার... মানে স্যার...
স্যারঃ আমি প্রতিদিন সকাল আটটায় রুমে আসি, রাত আটটা সময় রুম থেকে বের হই।এর মাঝখানে শুধু খেতে টয়লেট করতে আর নামায পড়তে বের হই।আর তুমি কিনা জানতে চাইছ আমি রুমে আসবো কিনা? তোমার কথায় মনে হচ্ছে আমি আমার রুমে আসিই না? তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে আমি ডিপার্টমেন্টের অতিথি!!! এতো বড় কথা বলার সাহস তুমি কোত্থেকে পেলে?
(ভয়ে বলতে পারিনি, আমি গত দুদিন তিনবেলা করে এসেও আপনাকে রুমে পাইনি)
আমিঃ সরি স্যার মানে স্যার আমি ঠিক বুঝতে পারিনি।
স্যারঃ এইতো, তোমাদের সমস্যাই হলো এটা।একজন শিক্ষকের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা তোমরা তোমাদের ফ্যামিলি থেকে শিখে আসোনা।আর কিছু একটা করেই বলে ফেল সরি।তুমি কি মনে কর এতো বড় বেয়াদবি করার পর সরি বলাই যথেষ্ট?
আমিঃ না স্যার, মানে স্যার আমি এক্সট্রিমলী সরি স্যার।আমি স্যার বিকাল ৫টায় আপনার রুমে আসবো স্যার।
স্যারঃ ঠিক আছে এসো।আর পারলে একজন শিক্ষকের সাথে কি করে কথা বলতে হয় সেটা শিখে এসো।
আমিঃ জ্বী স্যার, স্লামালেকুম স্যার।

তারপর আমি গেলাম টিউশনিতে।টিউশনি থেকে এসে স্যারের রুমে আসতে আসতে বেজে গেল ৫টা ১০।নক করার পর স্যার ভেতরে যেতে বললেন।ভেতরে ঢোকার পর স্যারের প্রতিক্রিয়া ছিলঃ
"ও... তাহলে তুমিই ফোন করেছিলে? এবার বুঝতে পেরেছ তো, সমস্যাটা কার? সময়ের সমস্যা তোমার থাকতে পারে, আমার নেই।তুমি অন্যকে প্রশ্ন করার আগে অবশ্যই নিজের অবস্থানটা একবার যাচাই করে নেবে।" পুরোটা সময় আমার জ্বী স্যার হ্যাঁ স্যার সরি স্যার ছাড়া কিছুই বলার ছিলনা।তারপর স্যার জিজ্ঞেশ করলেন "এবার বল কেন এসেছ"। আমি বললাম "স্যার রেজিস্ট্রেশনের জন্য"। স্যার বললেন ওটা ডিপার্টমেন্টাল হেড বরাবর পাঠিয়ে দিয়েছি। ঠিক আছে, এবার তুমি আসতে পারো।

এরপর দুটি টার্ম নির্বিঘ্নে পার হলো।তারপর ৩/১ এর অনলাইন রেজিস্ট্রেশনের পর স্যারের সাথে দেখা করতে গেলাম।যথারীতি প্রথমদিন স্যার রুমে নেই।কিন্তু ভাগ্য ভালো সেবার স্যার গরু ছাগলদের জন্য সময় বরাদ্দ দিয়ে রেখেছিলেন, পরদিন আর তার পরদিন অর্থাৎ রেজিস্ট্রেশনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিন বিকাল ৪টা-৫টা।কিন্তু দ্বিতীয় দিন বিকাল ৪টা ১৫ থেকে সাড়ে ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করেও স্যারকে রুমে পেলাম না।এর আগের বার স্যারকে ফোন করার দুঃসহ অভিজ্ঞতা থেকে আর ফোন করারও সাহস পেলাম না।পরদিন বিকেল ৪টা থেকে পৌনে ৫টা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পরও যখন স্যারকে রুমে পেলাম না, তখন ফোন করতে বাধ্য হলাম।সেদিন আর স্যার রাগারাগি করলেন না, কেননা স্যারই তো সময় দিয়ে রেখেছিলেন।তবুও স্যারের কাছে ব্যাপারটি ছিল অপমানজনক, এর প্রতিশোধ স্যার পরে নিয়েছিলেন। তখন স্যারের সাথে দেখা করতে এসেছিল আমার সিনিয়র জুনিয়র মিলিয়ে প্রায় ১০ জনের মতো।স্যার সবাইকে জিজ্ঞেশ করলেনঃ "তুমি ফোন দিয়েছিলে?"অবশেষে যখন আমাকে জিজ্ঞেশ করে জানতে পারলেন আমিই ফোন করেছিলাম, তখন স্যার ছোট্ট একটা ক্রুর হাসি দিয়েছিলেন, যে হাসির মর্মার্থ আমি বুঝতে পেরেছিলাম মাস দুই/তিনেক পরে।


সে কাহিনী পরের পর্বে বলবো।

Saturday, January 1, 2011

বুয়েটের স্টুডেন্টস এডভাইজার কাহিণীঃপর্ব-১

স্টুডেন্টস এডভাইজার ব্যাবস্থা সম্পর্কে কিছু কথাঃ

বুয়েটের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি অনন্য দিক হলো এই স্টুডেন্টস এডভাইজার, অন্তত আমার অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কোন বন্ধুর কাছে কখনো শুনিনি তাদের স্টুডেন্টস এডভাইজার বলে কোন বস্তু আছে।"স্টুডেন্টস এডভাইজার" নামক "পদ্ধতি" চালু করার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিল সম্ভবত বুয়েটের ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের "নাজুক" অবস্থার কিছুটা উন্নতি ঘটানো।বুয়েটে ঠিক কবে থেকে এই ব্যাবস্থা প্রবর্তন করা হয়েছে আমার জানা নেই।সম্ভবত বেশ অনেকদিন আগেই।তো এই স্টুডেন্টস এডভাইজার ব্যাবস্থা প্রবর্তন করার পরও ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কের যে রুপ দেখেছি গত ৫ বছর ধরে(বুয়েটে আমাদের কোর্সটি কিন্তু ৪ বছরের, তারপরও কি করে ৫ বছর থাকলাম সেটা অন্য গল্প), এই ব্যবস্থা প্রত্যাবর্তনের আগে ছাত্র শিক্ষকদের সম্পর্কের অবস্থাটা ঠিক কিরকম ছিল তা সাবেক বুয়েটিয়ানরাই ভালো বলতে পারবেন।
স্টুডেন্টস এডভাইজার ব্যাপারটা হলো বুয়েটে ভর্তি হওয়ার সময় প্রতি ৪ জন স্টুডেন্টের জন্য একজন করে শিক্ষক(প্রফেসর বা এসোসিয়েট প্রফেসর) নিযুক্ত করা হয়,যারা পরবর্তী ৫ বছর এদেরকে বিভিন্ন ব্যাপারে, বিশেষ করে প্রতি টার্মের রেজিস্ট্রেশনের ব্যাপারে সাহায্য করবেন।ব্যাপারটাকে এভাবেও বলা যেতে পারেঃবুয়েটের প্রফেসর, এসোসিয়েট প্রফেসরদের হাতে প্রতি বছর নতুন ভর্তি হওয়া চারজন "কচি শিশু"কে তুলে দেয়া হয় যাদেরকে তিনি পরবর্তী ৪ বছর ইচ্ছামতো "দলাইমলাই" করার অধিকার রাখেন।অন্তত আমার ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অনেকটা তাই ঘটেছিল।

আমার এডভাইজারের কথাঃ

আগে আমার সম্পর্কে বলে নিই, আমি পুরকৌশল বিভাগের '০৫ ব্যাচের ছাত্র।আমার এডভাইজারের নাম জানতে পারলাম যেদিন সোহরাওয়ার্দী হলে ভর্তি হলাম সেদিন।একটা লিস্ট থেকে এডভাইজারের নাম আর রুম নাম্বার জেনে নিয়ে গেলাম স্যারের সাথে দেখা করতে।প্রায় আধ ঘন্টা চেষ্টা করে স্যারদের রুম নাম্বার রহস্যের আংশিক সমাধান করে(সত্যি কথা বলতে কি সমাধানটা আমি একা করতে পারিনি,আমার সাথে আমার বড়ভাইও ছিলেন) স্যারের রুম খুঁজে পাওয়ার পর বুঝতে পারলাম, সেদিনকার মতো স্যারের সাথে দেখা করার অধিকার আমি হারিয়ে ফেলেছি।অর্থাৎ স্যার সেদিন তার সাথে দেখা করার জন্য ছাত্রদের সময় দিয়েছিলেন সকাল ৯টা-১০টা, আর আমি গিয়ে হাজির হয়েছিলাম ১২ টায়।স্যার তখন রুমে ছিলেন, দুমিনিটের কাজ, কিন্তু তাতে কি?গরু গাধাকে তো আর যখন তখন রুমে আসতে দেয়া যায় না, তাই না?
অগত্যা সেদিন স্যারের রুম চিনে এসে পরদিন সময়মতো(স্যারের বেঁধে দেয়া সময়,বিকাল ৪টা-৫টা) স্যারের রুমে গেলাম।চারটা থেকে সাড়ে চারটা পর্যন্ত অপেক্ষা করার পর স্যার দৃশ্যপটে উদয় হলেন, অর্থাৎ রুমে এলেন।এরপর সিরিয়ালে দাঁড়িয়ে অবশেষে স্যারের দরজায় পৌঁছালাম।এরপরের দৃশ্যাবলী ছিল অনেকটা এরকমঃ

আমি স্যারের দরজায় নক করলাম
স্যার বললেন "ভেতরে এসো।"
আমি গিয়ে বসলাম।এরপর স্যার আমাকে দুটি কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "এখান থেকে কোর্সের নামগুলো দেখে এখানে লিখ।এগুলোই তোমার আগামী টার্মের কোর্স।খবরদার কোন ভূল করবেনা।" দুর্ভাগ্যবশত সামান্য এই কাজটি করতে গিয়েও এক জায়গায় ভূল করে ফেললাম।স্যার এটা দেখে বললেনঃ"তুমি কি সত্যি বুয়েটে চান্স পেয়েছ? আমার কিন্তু সেরকম মনে হচ্ছেনা।আমি যদি এখন ক্লাস ফাইভের একটা বাচ্চাকে একটা জিনিস দেখে দেখে লিখতে বলি, সে সেটা করতে পারবে।এটুকু যোগ্যতাও তো তোমার নেই।যাই হোক যেটা ভূল করেছ সেটা কেটে নিচে আবার লিখ।" এবার ঠিকমতোই লিখতে পারলাম।এরপর স্যার বললেন, "ঠিক আছে তুমি এস।"
আমার তখনো ধারনা ছিল, এডভাইজারের সাথে নিয়মিত দেখা করতে হবে এবং তাদের "এডভাইজ" মেনে চলতে হবে।তো আমি চলে আসার আগে স্যারকে জিজ্ঞেশ করলামঃ"আবার কবে দেখা করবো স্যার?" স্যার বললেন "তুমি আমার সাথে নেক্সট দেখা করবে যেদিন এই টার্মের রেজাল্ট দেবে সেদিন।তার আগে নয়।তার আগ পর্যন্ত তোমার সাথে আমার কোন ধরনের কোন সম্পর্ক নেই"। একটু টাশকি খেয়েছিলাম, কিন্তু আবার খুশিও হয়েছিলাম এই ভেবে, যে আর যাই হোক নিয়মিত বিরতিতে এই ব্যাঘ্রসমতুল্য এডভাইজারে মুখোমুখি হতে হবেনা !

এই টার্মের রেজাল্ট যেদিন, সেদিন আবার স্যারের কাছে গেলাম।দুর্ভাগ্য, সেদিনও আবার একই ব্যাপার ঘটলো অর্থাৎ অনেক আগেই আমি এডভাইজারের সাথে দেখা করার অধিকার হারিয়ে ফেলেছিলাম।কেননা আমি স্যারের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম সকাল সাড়ে ১০টায়।কিন্তু অচ্ছুতদের জন্য স্যার সময় বরাদ্দ দিয়ে রেখেছিলেন সকাল ৯টা-১০টা।অগত্যা পরদিন আবার বরাদ্দকৃত সময়ের মধ্যেই স্যারের সাথে দেখা করতে গেলাম।যাওয়ার পর স্যার আমাকে একটা কাগজ ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "এটা ফটোকপি করে আর হল থেকে রেজিস্ট্রেশন পেপার নিয়ে আবার এসো।তার আগে এখানে সাইন কর।" স্যারের ওখানে গিয়ে কোথাও সাইন করতে হতে পারে আমি ধারনা করতে পারিনি।সুতরাং কলম নিয়ে যাইনি।কিন্তু সাইন তো করতেই হবে।সুতরাং স্যারকে বললামঃ "স্যার, সাইন করবো কি দিয়ে? কলম আনিনি, কলম দিন।"
স্যার রাগে ফেটে পড়লেন। বললেনঃ "কি ধরনের ছাত্র তুমি?এই তোমার ছাত্রত্বের নমুনা? রেজাল্ট নিতে এসেছ আর একটা কলমও নিয়ে আসোনি? তোমার কি মনে হয় বুয়েট কর্তৃপক্ষ তোমার জন্য তোমার জন্য খাতা কলম পেন্সিল সব নিয়ে বসে থাকবে?লজ্জা করেনা তোমার তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে এসেছ? তুমি কি নিজেকে ছাত্র ভেবে বসে আছ? পৃথিবীতে এমন কোন ছাত্র দেখেছ যার কাছে একটা কলম নেই? যত্তসব।"
তারপর স্যার অনেক কষ্ট করে নিজের পকেটে রাখা পার্কার পেনটা আমার হাতে তুলে দিলেন।সেটা দিয়ে সাইন করে চলে এলাম।তারপর বাকী কাজগুলো ঠিকমতোই করেছিলাম, সেখানে কোন ভূল করিনি।

এহেন এডভাইজারের সাথে পরবর্তীতে অনেকবারই আমার মোলাকাত হয়েছে।সেসব মোলাকাতের সবগুলোই আমার জন্য সুখকর ছিলনা।সেসব কথা পরের পর্বে বলবো, এক পর্বে সব কথা বলে শেষ করা যাবেনা।